শরীফ আহমেদ প্রতিবেদন:
নতুন বছর ২০২৬ হতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি সারা দেশের সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছায়নি।
এই সংকটের মধ্যেই খোলাবাজার থেকে প্রায় ২০ হাজার সেট বই জব্দ করা হয়েছে। এ সময় দুই জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গত শনিবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর ডেমরা থানা এলাকায় স্টাফ কোয়াটার মজিদ কোম্পানির মার্কেট ১ টি বড় গোডাউনে অভিযান চালিয়ে এসব সরকারি বই জব্দ করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের এসব বইয়ের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো– ড্রাইভার সিরাজুল ইসলাম উজ্জ্বল (৫৫) হেলপার দেলোয়ার হোসেন (৫৬)।
পরদিন রবিবার দুপুরে ঢাকা মিন্টু রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজধানী যাত্রাবাড়ী ডেমরা মাতুয়াইল এলাকায় একটি সক্রিয় চক্র বিভিন্ন স্হানীয় জমির মালিকানা জায়গা ভাড়া নিয়ে বড় সেট করে পুরান ঢাকা বাংলাবাজারের বড় বড় প্রেসগুলো এখানে চলে আসছে। প্রতি বছরের ন্যায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সরকারি টেন্ডারের মাধ্যমে নিম্ন মাধ্যমিক প্রথম শ্রেণী হতে মাধ্যমিক নবম দশম শ্রেণীর বইগুলো ছাপিয়ে থাকে এবং বাইন্ডিং করে ডেলিভারি দিয়ে থাকে।
তারই ধারাবাহিকতা একটি কুচক্রী মহল চক্র সরকারি পাঠ্যপুস্তক বই গুলো দেশের দুর্নীতিবাজ শিক্ষা কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ও কিছু অসাধু প্রেস মালিক কন্ট্রাকটারদের সিন্ডিকেট দ্বারা সারা দেশে বিনামূল্যের সরকারি অধিক মুনাফায় পাঠ্যবই বিক্রির উদ্দেশে মজুদ করেছে গোপন গোডাউনে!!
এমন তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা সংস্থা ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুই ট্রাক বই জব্দ করা হয়। যেখানে বিভিন্ন শ্রেণীর প্রায় ২০ হাজার সেট বই রয়েছে। ট্রাক চালক ও হেলপার সিরাজুল ও দেলোয়ার নামে ২ জনকে আটক করেছে ডিবি পুলিশ।
তাদেরকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, ঢাকা সহ ঢাকার বাইরেও এরকম বেশকিছু গোপন গোডাউনে সরকারি বই মজুদ করে রাখা আছে! এছাড়াও মাতুয়াইল এলাকাসহ নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি চক্রের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেফতারে ডিবির গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উক্ত জব্দ করা বইগুলোর বিষয়ে আদালতকে জানানো হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এনসিটিবিকে হস্তান্তরের কথাও জানান ডিবির এই উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডিবির যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘বইগুলো পরিবহনের জন্য যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, একটা কন্টাকটার চক্র মূল হোতা নুরুল আমিন প্রেসে পারভেজ (রুপগঞ্জ), আমিন আর্ট প্রেসের সোহেল, চোরাই বইয়ের টেন্ডার নেওয়া আলমাস, চোরাই বইয়ের ট্রান্সপোর্ট পরিবহন কন্টাকটার সাজু, সহযোগি সুমন সহ বিশাল একটি সিন্ডিকেট বইগুলো নিয়ে যায়। এরপর অতিরিক্ত দামে বইগুলো খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়।
অতিরিক্ত বই ছাপানোর সুযোগ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা সরকারি কার্যাদেশ পেয়ে থাকে এ রকম ১১৬টি প্রেসে বই ছাপানো হয়। ঢাকার মাতুয়াইল তার আশপাশে বাংলা বাজারসহ ঢাকার বাইরেও কয়েকটি প্রেসে ছাপানো হয়। অতিরিক্ত বই ছাপানোর সুযোগ আছে কিনা বিষয়টা তদন্তাধীন। যদি অনুসন্ধানে অতিরিক্ত বই ছাপানো হয়েছে, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চোরাই বইয়ের মূল হোতা আমিন আর্ট প্রেসের মালিক সোহেল,
মিরাজ প্রেস নুরুল ইসলাম, সৃষ্টি প্রেস, সোনালী প্রেস, নুরুল আমিন প্রিন্টিং প্রেসসহ আরো বেশ কিছু প্রেসের ও ইনার পেজের নাম সহ পাওয়া যায়।
এদিকে এনসিটিবি অথবা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) কেউ জড়িত কিনা জানতে চাইলে মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘এনসিটিবির দুটা গোডাউন রয়েছে, একটা তেজগাঁও ও আরেকটা টঙ্গীতে। সেখানেই বইগুলো সংরক্ষণ করা হয়। এর বাইরে কোথাও সংরক্ষণের সুযোগ নেই। ভেতরের কারও সংশ্লিষ্টতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গ্রেফতার সিরাজুল ২ বছর আগে একই অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিল জানিয়ে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এবার ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার গোডাউন থেকেই বইগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। বইগুলো প্রতি পিস ১০-১২ টাকা করে বইগুলো কিনে ৮০-৮৫ টাকায় বিক্রি করে আসছিলো এই এ সঙ্গবদ্ধ চক্র। এরা বিতরণ এবং পরিবহনের অনিয়মে কারসাজি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন আরও কিছু নাম আমরা পেয়েছি। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারে আমলে প্রতি বছরের প্রথম দিন স্কুলে স্কুলে বই উৎসব করে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার রেওয়াজ শুরুটা হয়েছিল ২০১০ সালে। সেটা দেখা গেছে গত বছরেও। তবে ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই উৎসবে ভাটা পড়েছে।
নতুন বছরের প্রথম দুই দিনে ৪১ কোটি বইয়ের মধ্যে ১০ কোটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বাকি বই ৩০ জানুয়ারির মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার আশা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। স বাড়ি ব বই না পাওয়া পর্যন্ত এনসিটিবির ওয়েবসাইটে আপলোড করা বইয়ের পিডিএফ কপি নিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।