
শরীফ আহমেদ প্রতিবেদন:
নতুন বছর শুরুর মাস পেরিয়ে গেলেও সারা দেশের সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছায়নি। এ সংকটের মধ্যেই খোলাবাজার থেকে প্রায় ২০ হাজার সেট বই জব্দ করা হয়েছে। এ সময় দুই জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গত শনিবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর ডেমরা থানা এলাকায় স্টাফ কোয়াটার মজিদ কোম্পানির মার্কেট ১ টি বড় গোডাউনে অভিযান চালিয়ে এসব সরকারি বই জব্দ করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের এসব বইয়ের বাজারমূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো– ড্রাইভার সিরাজুল ইসলাম উজ্জ্বল (৫৫) হেলপার দেলোয়ার হোসেন (৫৬)।
গত রবিবার দুপুরে মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি চক্র রাজধানী যাত্রাবাড়ী ডেমরা থানা মাতুয়াইল এলাকায় বিভিন্ন মালিকানা জায়গা ভাড়া নিয়ে বড় সেট করে বাংলাবাজারের বড় বড় পেজগুলি এখানে চলে আসছে। সরকারি টেন্ডারের মাধ্যমে নিম্ন মাধ্যমিক প্রথম থেকে মাধ্যমিক দশম শ্রেণি বইগুলো ছাপিয়ে থাকে এবং বাইন্ডিং করে ডেলিভারি দিয়ে থাকে। তারই ধারাবাহিকতা একটি কুচক্রী চক্র সরকারি বিভিন্ন থানা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কর্মকর্তারা ও কিছু অসাধু প্রেস মালিক মিলে সারা দেশে বিনামূল্যের সরকারি পাঠ্যবই বিক্রির উদ্দেশে মজুদ করেছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দুই ট্রাক বই জব্দ করা হয়। যেখানে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ২০ হাজার সেট বই রয়েছে। সিরাজুল ও দেলোয়ারের বাইরেও আরও মাতুয়াইল সহ নারায়ণগঞ্জ কয়েকটি চক্রের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেফতারে ডিবির তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।’
জব্দ করা বইগুলোর বিষয়ে আদালতকে জানানো হবে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এনসিটিবিকে হস্তান্তরের কথাও জানান ডিবির এই কর্মকর্তা।
এক প্রশ্নের জবাবে ডিবির যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘বইগুলো পরিবহনের জন্য যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, একটা কন্ডাক্টর চক্র মূল হোতা নুরুল আমিন প্রেসে পারভেজ রুপগঞ্জ, আমেনা প্রেসের সোহেল, আলমাস, ট্রান্সপোর্ট কন্টাকটার সাজু, সুমন সহ বিশাল একটি সিন্ডিকেট বইগুলো নিয়ে যায়। এরপর অতিরিক্ত বই এনে খোলা বাজারে বিক্রি করে।
অতিরিক্ত বই ছাপানোর সুযোগ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা সরকারি কার্যাদেশ পেয়ে থাকে এ রকম ১১৬টি প্রেসে বই ছাপানো হয়। ঢাকার মাতুয়াইল বাংলা বাজার এবং ঢাকার বাইরেও কয়েকটি প্রেসে ছাপানো হয়। অতিরিক্ত বই ছাপানোর সুযোগ আছে কিনা বিষয়টা তদন্তাধীন। যদি অনুসন্ধানে পাই অতিরিক্ত বই ছাপানো হয়েছে, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্ণমালা প্রেস, মিরাজ প্রেস, সৃষ্টি প্রেস, সোনালী প্রেস, নুরুল আমিন প্রিন্টিং প্রেস, আমিনা আর্ট প্রেসসহ আরো বেশ কিছু প্রেসের ইনার পেজের নাম সহ পাওয়া যায়।
এদিকে এনসিটিবি অথবা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) কেউ জড়িত কিনা জানতে চাইলে মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘এনসিটিবির দুটা গোডাউন রয়েছে, একটা তেজগাঁও ও আরেকটা টঙ্গীতে। সেখানেই বইগুলো সংরক্ষণ করা হয়। এর বাইরে কোথাও সংরক্ষণের সুযোগ নেই। ভেতরের কারও সংশ্লিষ্টতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গ্রেফতার সিরাজুল ১০ বছর আগে একই অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিল জানিয়ে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এবার তার গোডাউন থেকেই বইগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। সে ১০-১২ টাকা করে বইগুলো কিনে ৮০-৮৫ টাকায় বিক্রি করে আসছিল। বিতরণ এবং পরিবহনের অনিয়মে কার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন আরও কিছু নাম আমরা পেয়েছি। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারে আমলে প্রতি বছরের প্রথম দিন স্কুলে স্কুলে বই উৎসব করে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার রেওয়াজ শুরুটা হয়েছিল ২০১০ সালে। সেটা দেখা গেছে গত বছরেও। তবে ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই উৎসবে ছেদ পড়েছে।
নতুন বছরের প্রথম দুই দিনে ৪১ কোটি বইয়ের মধ্যে ১০ কোটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বাকি বই ৩০ জানুয়ারির মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার আশা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সব বই না পাওয়া পর্যন্ত এনসিটিবির ওয়েবসাইটে আপলোড করা বইয়ের পিডিএফ কপি নিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।